টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় ড্রোন দুর্ঘটনা: আতঙ্কে শতাধিক মুসল্লি আহত
বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত চলাকালে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) সকালে মোনাজাত চলার সময় দুটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইজতেমা ময়দানে ও টটঙ্গী মেডিকেল গেটের সামনে আছড়ে পড়ে। বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে অন্তত ১০০ জন মুসল্লি আহত হন।
ঘটনার বিবরণঃ
আখেরি মোনাজাত শুরু হয় সকাল ৯টা ১১ মিনিটে এবং শেষ হয় ৯টা ৩৬ মিনিটে। মোনাজাত পরিচালনা করেন কাকরাইল মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা জুবায়ের। এই সময়েই দুইটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
প্রথম ড্রোনটি ইজতেমা ময়দানের বিদেশি নিবাসের পূর্বপাশে টিনের ছাউনির ওপর আছড়ে পড়ে। বিকট শব্দে মুসল্লিরা ভয় পেয়ে যান এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকেন। দ্বিতীয় ড্রোনটি টঙ্গী মেডিকেল গেটের সামনে পড়ে গেলে গ্যাস বেলুনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বিস্ফোরণের মতো শব্দ হয়, যা আরও বেশি আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
আশেপাশের মুসল্লিরা ভেবেছিলেন, কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছে বা হামলা হয়েছে। আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটতে গিয়ে অনেকে পড়ে গিয়ে আহত হন।
আহতদের সংখ্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাঃ
টঙ্গী স্টেশন রোডের ফ্লাইওভারের পাশে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় শতাধিক মুসল্লি আহত হন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে গাজীপুর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে অনেকেই মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতপ্রাপ্ত হন।
আহতদের তালিকায় রয়েছেন—
- ঢাকার আবুল কালাম (৬০), আব্দুল করিম (২৮), সাইদুল ইসলাম (৩৮)
- নারায়ণগঞ্জের আল-আমীন (৩২), আনোয়ার হোসেন (৪৩), আমজাদ (৩০)
- টঙ্গীর ওবায়দুল্লাহ (৫২), কবির হোসেন (৪৬), নাজিম উদ্দিন (৪০)
- গাজীপুরের কাওসারুল আলম (২৮), রাতুল (১৮), মোশারফ (৩০)
- সিলেটের জহুরুল ইসলাম (৩১), ময়মনসিংহের আলী নেওয়াজ (৩৮)
- নাটোরের আফতাব উদ্দিন (৪৩), মামুন হোসেন (২৯)
অনেক আহত ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণঃ
টঙ্গীর পাগাড় এলাকার মুসল্লি জাফর উদ্দিন বলেন,
"আমি মোনাজাতে ছিলাম, হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়। সবাই দৌড়াতে থাকে, আমিও পড়ে গিয়ে আহত হই।"
আরেক মুসল্লি মকবুল হোসেন বলেন,
"আমি মসজিদের ভেতরে ছিলাম। হঠাৎ দেখি চারদিকে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। দৌড়ানোর সময় পড়ে গেলে অনেকে আমার ওপর দিয়ে চলে যায়, এতে আমি আহত হই।"
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিক্রিয়াঃ
গাজীপুর মেট্রোপলিটনের টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন,
"একটি ড্রোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইজতেমা ময়দানের টিনের ছাউনিতে পড়ে। এতে কেউ নিহত হয়নি, তবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।"
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন,
"কামারপাড়া সড়কে ড্রোনটি পড়ে গেলে সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, যার ফলে আহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।"
ড্রোন ব্যবহারের নিয়ম ও নিরাপত্তার প্রশ্নঃ
ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি লাগে। ইজতেমার মতো বড় জমায়েতে ড্রোন ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
- ড্রোনের ফ্লাইট পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
- বিশেষ অনুমতি ছাড়া জনসমাগমের স্থানে ড্রোন উড়ানো উচিত নয়।
- ড্রোন ব্যবহারের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
ইজতেমায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাঃ
প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমায় লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগম হয়। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের ইজতেমায় প্রায় ১০,০০০ পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। তবে ড্রোন দুর্ঘটনার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
গাজীপুর পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে,
"ভবিষ্যতে ইজতেমার সময় ড্রোনের অনুমতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, যাতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে।"
উপসংহারঃ
বিশ্ব ইজতেমা মুসলমানদের জন্য এক বড় ধর্মীয় সমাবেশ। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ড্রোন দুর্ঘটনা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের উচিত ড্রোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আল্লাহ যেন আহত মুসল্লিদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন এবং ইজতেমার মতো ধর্মীয় সমাবেশ সবসময় শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ থাকে—এই দোয়াই সকলের।