বিশ্ব ইজতেমা: ইতিহাস, উদ্দেশ্য ও ২০২৬ সালের সময়সূচি
বিশ্ব ইজতেমা বা তাবলীগ ইজতেমা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জমায়েত। হজ্জের পরেই মুসলমানরা দ্বীনের টানে সবচেয়ে বেশি একত্রিত হন এই ইজতেমায়। বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে প্রতি বছর লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে এই রুহানি মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো বিশ্ব ইজতেমা কী, এর ইতিহাস, উদ্দেশ্য এবং ২০২৬ সালের ইজতেমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
ইজতেমা শব্দের অর্থ কী ও বিশ্ব ইজতেমা কী?
'ইজতেমা' (إجتماع) একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো একত্রিত হওয়া, সম্মেলন বা সমাবেশ। আর 'বিশ্ব ইজতেমা' বলতে বোঝায় বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের দ্বীনি উদ্দেশ্যে এক বিশাল সমাবেশ।
ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে, ঈমান ও আমল শেখার জন্য এবং সারা বিশ্বে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ফিকির নিয়ে যে বিশেষ জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়, তাকেই তাবলীগ ইজতেমা বা বিশ্ব ইজতেমা বলা হয়।
ইজতেমার উদ্দেশ্য কী?
অনেকে মনে করেন ইজতেমা হয়তো কোনো মেলা বা উৎসব। বিষয়টি তা নয়। ইজতেমার মূল উদ্দেশ্য হলো:
- আত্মশুদ্ধি (ইসলাহ): নিজের ঈমান ও আমলকে মজবুত করা।
- দাওয়াত: সারা বিশ্বে আল্লাহর দ্বীন কীভাবে পৌঁছাবে, সেই ফিকির করা এবং জামাত তৈরি করে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া।
- শিক্ষণ: দ্বীনের বুনিয়াদি বিষয়গুলো ও সুন্নতি জিন্দেগী যাপন শেখা।
- ঐক্য: মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য গড়ে তোলা।
বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাতা
তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। তিনি ভারতের দিল্লির নিজামুদ্দিনে এই মেহনতের সূচনা করেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে যে 'বিশ্ব ইজতেমা' হয়, তার একটি ক্রমবিকাশের ইতিহাস রয়েছে।
বাংলাদেশে ইজতেমা কত সাল থেকে শুরু হয়?
বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ইজতেমার ইতিহাস বেশ পুরনো।
- ১৯৪৬ সাল: সর্বপ্রথম ঢাকার কাকরাইল মসজিদে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।
- ১৯৪৮ সাল: এরপর চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়।
- ১৯৫৮ সাল: জায়গার সংকুলান না হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা স্থানান্তর করা হয়।
- ১৯৬৭ সাল: মুসল্লিদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৬৭ সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে স্থায়ীভাবে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই ময়দানেই ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
বিশ্ব ইজতেমায় কি হয়?
বিশ্ব ইজতেমায় মূলত তিন দিনব্যাপী আমল চলে। এখানে কোনো রাজনীতি বা দুনিয়াবী আলোচনা হয় না। কার্যক্রমগুলো হলো:
- আম বয়ান: বিশ্ববরেণ্য আলেম ও মুরুব্বীগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঈমান-আমলের বয়ান করেন।
- তালিম ও তশকিল: দ্বীনের জরুরি মাসায়েল শেখানো হয় এবং মানুষদের আল্লাহর রাস্তায় সময় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত (তশকিল) করা হয়।
- যৌতুকবিহীন বিবাহ: দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য সুন্নতি তরিকায় যৌতুকবিহীন বিবাহের আয়োজন করা হয়।
- আখেরী মোনাজাত: ইজতেমার শেষ দিন লাখো মুসল্লি একসাথে আল্লাহর দরবারে গুনাহ মাফের জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোনাজাত করেন।
বিশ্ব ইজতেমা ২০২৬ ও সময়সূচি
সাধারণত প্রতি বছর জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত জুমুআর বারকে কেন্দ্র করে তিন দিনের ইজতেমা সাজানো হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব ইজতেমা জানুয়ারি ২, ৩, ৪ তারিখ প্রথম পর্ব ও ৯, ১০, ১১ তারিখ দ্বিতীয় পর্ব হওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচনের কারনে রমযানের পর ইজতেমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারিখ এখন পর্যন্ত ঘোষনা করা হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আগে যেখানে সরকার প্রধানগন ময়দানে এসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতেন আর সেখানে তাবলীগের বিভক্তির পর থেকে এখন বিশ্ব ইজতেমা সরকারি সিদ্ধান্তের উপর অনেকটা নির্ভরশীল।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
নিচে বিশ্ব ইজতেমা সম্পর্কে পাঠকদের মনে জাগা সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
প্রশ্ন: ইজতেমা কি জায়েজ বা ইজতেমা করা কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইজতেমা করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ। দ্বীনি ইলম শেখা ও দাওয়াতের উদ্দেশ্যে একত্রিত হওয়া ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একে বিদআত বলার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এটি কোনো নতুন ইবাদত নয় বরং দাওয়াতের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি।
প্রশ্ন: বিশ্ব ইজতেমার প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর: তাবলীগ জামাতের মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। তবে বাংলাদেশে টঙ্গীর ইজতেমা বিশ্বব্যাপী রূপ লাভ করার পেছনে দেশি-বিদেশি অনেক মুরুব্বীর অবদান রয়েছে।
প্রশ্ন: বিশ্ব ইজতেমা কোথায় হয়?
উত্তর: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে, তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন: প্রথম বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশে কত সালে অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম ইজতেমা হয় ১৯৪৬ সালে কাকরাইল মসজিদে। আর তুরাগ তীরে শুরু হয় ১৯৬৭ সালে।
প্রশ্ন: বিশ্ব ইজতেমায় কত লোক হয়?
উত্তর: এর সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, প্রতি পর্বে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ এবং আখেরী মোনাজাতে প্রায় ৪০-৫০ লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন: তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা কত সাল থেকে শুরু হয়?
উত্তর: ১৯৬৭ সাল থেকে তুরাগ নদীর তীরে নিয়মিত ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
প্রশ্ন: আগামী বিশ্ব ইজতেমা কবে শুরু হবে?
উত্তর: বিশ্ব ইজতেমা ২০২৬ রমযানের পর অনুষ্ঠিত হবে ইন শা আল্লাহ।