পানি খাওয়ার সুন্নত | পানি পান করার ৬টি আদব ও দোয়া হাদিসসহ
পানি আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আমি পানি থেকেই প্রতিটি প্রাণসত্তা সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আম্বিয়া: ৩০)। একজন মুমিনের প্রতিটি কাজই ইবাদত, যদি তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক হয়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা বহুবার পানি পান করি। আমরা যদি পানি খাওয়ার সুন্নত ও আদবগুলো মেনে চলি, তবে এই সাধারণ কাজটিই অশেষ সওয়াবের কারণ হবে।
পানি পান করার ৬টি সুন্নত
হাদিস শরীফ পর্যালোচলা করলে পানি পান করার ৬টি সুন্নাত বা আদব পাওয়া যায়। এগুলো হলো:
- ডান হাতে পান করা: বাম হাত দিয়ে পান করা নিষেধ। কারণ শয়তান বাম হাত দিয়ে পান করে।
- বসে পান করা: দাঁড়িয়ে পানি পান করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
- বিসমিল্লাহ বলা: পান করার শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া।
- দেখে পান করা: গ্লাসে কোনো ময়লা বা পোকা আছে কি না তা দেখে নেওয়া।
- তিন নিঃশ্বাসে পান করা: এক ঢোক বা এক নিঃশ্বাসে পান না করে, তিনবারে শ্বাস নিয়ে পান করা।
- আলহামদুলিল্লাহ বলা: পান করা শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
পানি পান করার দোয়া (বাংলা ও আরবি)
অনেকেই জানতে চান পানি খাওয়ার দোয়া কী। মূলত পানি পানের শুরুতে ও শেষে দুটি দোয়া বা জিকির রয়েছে।
পানি পান করার আগে:
পানি পান করার শুরুতে বলতে হয়:
আরবি: بِسْمِ اللهِ (বিসমিল্লাহ)
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি।
পানি পান করার পর দোয়া:
পান করা শেষ হলে বলতে হয়:
আরবি: الْحَمْدُ لِلَّهِ (আলহামদুলিল্লাহ)
অর্থ: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য।
Pani khawar dua bangla: মূলত 'বিসমিল্লাহ' এবং 'আলহামদুলিল্লাহ' বলাই সুন্নাহ। তবে কেউ চাইলে এই বড় দোয়াটিও পড়তে পারেন যা রাসুল (সা.) মাঝেমধ্যে পড়তেন: "আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি ছাকানা আজবান ফুরাতান বিরাহমাতিহি, ওয়া লাম ইয়াঝআলহু মিলহান উজাজান বিজুনুবিনা।"
দাঁড়িয়ে নাকি বসে? পানি পান করার হাদিস
বসে পানি পান করার হাদিস: হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “নবী কারীম (সা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।” (সহীহ মুসলিম)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতেও দাঁড়িয়ে পানি পান করলে কিডনি ও পাকস্থলীর ক্ষতি হতে পারে।
কখন দাঁড়িয়ে পান করা জায়েজ?
সাধারণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে পান করা মাকরুহ। তবে দুটি ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে পানি পান করা জায়েজ এবং বরকতময়:
- জমজমের পানি: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আমি নবীজি (সা.)-কে জমজমের পানি পান করালাম, তিনি দাঁড়িয়ে পান করলেন।” (সহীহ বুখারী)।
- ওজুল অবশিষ্ট পানি: ওজু করার পর পাত্রে অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করা সুন্নাহ এবং এটি রোগের শেফা।
তিন নিঃশ্বাসে পানি পানের রহস্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক নিঃশ্বাসে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা উটের মতো এক শ্বাসে পানি পান করো না; বরং দুই বা তিন শ্বাসে পান করো।” (তিরমিজি)।
বিজ্ঞান বলছে, এক নিঃশ্বাসে দ্রুত পানি পান করলে শ্বাসনালীতে পানি ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং এটি হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তিন শ্বাসে পান করলে শরীরের তাপমাত্রা ও পানির তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সকালে খালি পেটে পানি খাওয়ার নিয়ম
অনেকে জানতে চান সকালে খালি পেটে পানি খাওয়ার অপকারিতা আছে কি না। ইসলাম ও বিজ্ঞান মতে, সকালে খালি পেটে পানি পান করা অত্যন্ত উপকারী।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অভ্যাস ছিল সকালে খালি পেটে মধুর শরবত বা 'নাবীজ' (পানিতে ভেজানো খেজুরের নির্যাস) পান করা। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ (Toxin) বের করে দেয় এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করে। সুতরাং, সকালে খালি পেটে বিশুদ্ধ পানি পান করা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী।
পানির অপচয় সম্পর্কে ইসলাম
পানি অতি মূল্যবান সম্পদ। রাসুল (সা.) পানির অপচয় সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা অপচয় করো না, এমনকি যদি বহমান নদীর তীরেও থাকো।” (ইবনে মাজাহ)। তাই গ্লাসে ততটুকুই পানি নেওয়া উচিত যতটুকু পান করা হবে।
জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
সকালে খালিপেটে পানি পান করা কি নিষেধ?
না, নিষেধ নয়। বরং এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং সুন্নাহ সম্মত (শরবত বা নাবীজ হিসেবে)।
এক নিঃশ্বাসে পানি পান না করে দুই বা তিন নিঃশ্বাসে পান করো?
হ্যাঁ, এটিই রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ। গ্লাসের মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলা যাবে না, বরং মুখ সরিয়ে নিঃশ্বাস নিতে হবে।
উটের মত এক নিঃশ্বাসে পান করবেন না—এর অর্থ কী?
পশুরা সাধারণত একনাগাড়ে পানি পান করে। মুমিনদের আদব হলো ধীরস্থিরভাবে বিরতি দিয়ে পানি পান করা।
ইসলামে দাঁড়িয়ে পানি পান করা কি জায়েজ?
প্রয়োজনে বা অপারগ হলে জায়েজ আছে, তবে সাধারণ অবস্থায় এটি মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
জমজমের পানি বসে খাওয়া ভালো নাকি দাঁড়িয়ে খাওয়া ভালো?
জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করা উত্তম বা মুস্তাহাব। এটি রাসুল (সা.)-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবে বসে পান করলেও কোনো গুনাহ নেই।
জমজমের পানি কি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানি?
হ্যাঁ, হাদিস শরীফে এসেছে, “ভূপৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠ পানি হলো জমজমের পানি।”
নবীজি কি খাওয়ার সময় পানি পান করতেন?
চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সুন্নাহ অনুযায়ী, খাওয়ার মাঝখানে অল্প পানি পান করা যেতে পারে, তবে খাওয়ার পরপরই বেশি পানি পান করা হজমের জন্য ভালো নয়।
ইসলামে কতটুকু পানি পান করা উচিত?
শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পানি পান করা উচিত। রাসুল (সা.) পেটকে তিন ভাগ করতে বলেছেন: এক ভাগ খাবার, এক ভাগ পানি এবং এক ভাগ শ্বাসের জন্য খালি রাখা।
উপসংহার
আসুন, আমরা পানি পানের সময় তাড়াহুড়ো না করে নববী আদর্শ মেনে চলি। এতে আমাদের পিপাসাও মিটবে, শরীর সুস্থ থাকবে এবং আমলনামায় সওয়াবও জমা হবে।