রাস্তার আদব কয়টি? | রাস্তায় চলার সুন্নাহ ও রাস্তার হক হাদিসসহ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মসজিদ থেকে শুরু করে রাজপথ—সর্বত্রই মুমিনের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। অনেকেই জানতে চান রাস্তার আদব কয়টি বা রাস্তায় চলার সুন্নাহ কী। আজকের আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে রাস্তার হক এবং পথ চলার আদব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রাস্তার হক সম্পর্কে হাদীস: রাস্তার আদব কয়টি ও কি কি?

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে রাস্তার মোড়ে বা পথের ওপর অহেতুক বসতে নিষেধ করেছেন। সাহাবীরা যখন প্রয়োজনের কথা জানালেন, তখন নবীজি (সা.) রাস্তার হক আদায় করার নির্দেশ দেন।

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদিস অনুযায়ী, রাস্তার হক বা আদব মূলত ৫টি (কোনো কোনো বর্ণনায় ৬টির কথাও এসেছে):

  1. দৃষ্টি অবনত রাখা (গদদে বাসার): পরনারী বা হারাম কিছু দেখা থেকে চোখকে হেফাজত করা।
  2. কষ্টদায়ক বস্তু সরানো (কাফফুল আযা): মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং রাস্তা থেকে কাঁটা, পাথর বা ময়লা সরানো।
  3. সালামের উত্তর দেওয়া (রদ্দুস সালাম): কেউ সালাম দিলে তার উত্তর দেওয়া ওয়াজিব।
  4. সৎ কাজের আদেশ করা: কাউকে ভালো কাজ করতে দেখলে উৎসাহ দেওয়া।
  5. অসৎ কাজে নিষেধ করা: অন্যায় কিছু হতে দেখলে সাধ্যমত বাধা দেওয়া বা ঘৃণা করা।
  6. পথহারাকে পথ দেখানো: (অন্য বর্ণনায়) কোনো ব্যক্তি পথ ভুলে গেলে তাকে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া।

রাস্তায় চলার সুন্নাহ ও হাঁটার নিয়ম

একজন মুমিনের হাঁটাচলাও ইবাদত হতে পারে যদি তা সুন্নাহ মোতাবেক হয়। হাঁটার সুন্নাহ গুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • বিনম্রভাবে হাঁটা: দম্ভভরে বা অহংকার করে হাঁটা আল্লাহ পছন্দ করেন না। কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে, “আর তুমি জমিনে দম্ভভরে বিচরণ করো না।” (সূরা বনি ইসরাইল: ৩৭)
  • মধ্যম গতিতে হাঁটা: খুব ধীরেও নয়, আবার দৌড়ানোর মতো জোরেও নয়। রাসূল (সা.) সামনের দিকে একটু ঝুঁকে দ্রুতলয়ে হাঁটতেন, যেন তিনি কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে নামছেন।
  • অপ্রয়োজনে এদিক-সেদিক না তাকানো: পথের দিকে নজর রেখে হাঁটা।
  • জুতার শব্দ না করা: এমনভাবে হাঁটা যাতে বিকট শব্দ না হয় এবং অন্যের মনোযোগ নষ্ট না হয়।

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা ও রাস্তা নির্মাণের ফজিলত

ইসলামে জনকল্যাণমূলক কাজকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

রাস্তা পরিষ্কারের সওয়াব:

রাসূল (সা.) বলেছেন, “ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।” (সহীহ মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি রাস্তার মাঝখান থেকে একটি কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তার এই কাজ পছন্দ করেছেন এবং তাকে জান্নাত দান করেছেন।

রাস্তা নির্মাণের ফজিলত:

মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণ বা মেরামত করা ‘সদকায়ে জারিয়া’র অন্তর্ভুক্ত। যতদিন মানুষ ওই রাস্তা দিয়ে চলবে, নির্মাতা কবরে শুয়েও এর সওয়াব পেতে থাকবেন।

রাস্তা বন্ধ করার হাদিস ও সতর্কতা

রাস্তা বন্ধ করে মানুষকে কষ্টে ফেলা হারাম। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের চলাচলের রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের অভিশাপ।”

তাই নির্মাণ সামগ্রী, দোকানপাট বা সমাবেশ করে জনগনের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটি জঘন্য গুনাহের কাজ।

রাস্তার কোন পাশে হাঁটা সুন্নত এবং বাংলাদেশের নিয়ম

অনেকেই জানতে চান “রাস্তার কোন পাশে হাঁটা সুন্নত”। ইসলামে সাধারণভাবে ভালো ও সম্মানজনক কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা সুন্নাহ। তবে রাস্তায় হাঁটার ক্ষেত্রে সরাসরি ডান বা বাম নির্ধারণ করে কোনো নির্দিষ্ট সুন্নাহ নেই।

রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি হলো—নিরাপত্তা। অর্থাৎ এমনভাবে হাঁটা, যাতে নিজের বা অন্যের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। এই কারণে সুন্নাহ ডান দিক হওয়া সত্ত্বেও, যদি নিরাপত্তার খাতিরে বাম দিক দিয়ে হাঁটা বেশি নিরাপদ হয়, তাহলে বাম দিক দিয়েই হাঁটা উচিত।

কারণ, নিজেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলা ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই যেখানে যে দিক দিয়ে হাঁটা নিরাপদ, শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটাই সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

রাস্তায় চলার দোয়া

ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামার সময় রাসূল (সা.) এই দোয়াটি পড়তেন, যা শয়তান থেকে হেফাজত করে:

উচ্চারণ: “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
অর্থ: আল্লাহর নামে বের হলাম, আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই।

উপসংহার

রাস্তা কেবল চলাচলের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের ঈমানের পরীক্ষার স্থান। আসুন, আমরা রাস্তায় চলার সময় অন্যের হক নষ্ট না করি, কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলি এবং সুন্নাহ মেনে পথ চলি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

Previous Post