তাবলীগ জামাত: ভুল ধারণা, সমালোচনা ও শরীয়ী দলিল ভিত্তিক বিশ্লেষণ
বর্তমান সময়ে দাওয়াত ও তাবলীগ জামাত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাবলীগ জামাতের বিধান, এর প্রয়োজনীয়তা এবং বিরোধীদের প্রশ্নের দালিলিক জবাব নিচে আলোচনা করা হলো।
তাবলীগ জামাত কি জায়েজ? শরীয়ী দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকেই প্রশ্ন করেন, "তাবলীগ জামাত কি জায়েজ?" এর উত্তর হলো—নিঃসন্দেহে জায়েজ এবং একটি মহৎ কাজ। কারণ তাবলীগ জামাতের মূল কাজ হলো মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, যা কুরআনের সরাসরি নির্দেশ।
কুরআন থেকে দলিল:
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে।”
সূরা আলে ইমরান: ১১০
তাবলীগ জামাত মূলত এই আয়াতেরই ব্যবহারিক রূপ। তারা মানুষকে ঈমান, নামাজ এবং সুন্নতের দিকে আহ্বান করে। কোনো নির্দিষ্ট দলের দিকে নয়, বরং আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহ্বান করা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ ও সওয়াবের কাজ।
তাবলীগ জামাত কি বিদআত? একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
বিরোধীদের অন্যতম অভিযোগ হলো "তাবলীগ জামাত কি বিদআত?" তারা বলে, নবীজির যুগে ৩ দিন, ৪০ দিন (চিল্লা) বা ৪ মাসের নির্ধারিত পদ্ধতি ছিল না।
এর জবাবে বলা যায়, শরীয়তে 'পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনা' (Administrative Arrangement) এবং 'ধর্মীয় সংযোজন' (Religious Innovation) এক নয়।
- মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা: নবীজির যুগে বর্তমানে প্রচলিত মাদরাসার ক্লাস রুটিন, পরীক্ষা বা সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু দ্বীন শেখা ফরজ। তাই দ্বীন শেখার সুবিধার্থে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে যা বিদআত নয়।
- তাবলীগের দিন নির্ধারণ: ঠিক তেমনি, ৩ দিন বা ৪০ দিন কোনো শরীয়ী ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং এটি একটি ‘নেজাম’ বা রুটিন, যাতে মানুষ দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে দ্বীন শিখতে পারে।
মুফতিয়ানে কেরাম ও উলামায়ে কেরাম একমত যে, দ্বীনি কাজের সুবিধার্থে কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েজ, যতক্ষণ না সেটাকে শরীয়তের অংশ মনে করা হয়। তাবলীগ জামাত এই সময়গুলোকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করে না, বরং আত্মশুদ্ধির রুটিন মনে করে।
তাবলিগ করা কি ফরজ?
"তাবলিগ করা কি ফরজ?" এই প্রশ্নের উত্তর হলো, দাওয়াতের কাজ মৌলিকভাবে ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক দায়িত্ব)। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে বা নিজের অধীনস্থদের জন্য তা ফরযে আইন (ব্যক্তিগত দায়িত্ব) হতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও (মানুষের কাছে) পৌঁছে দাও।”
সহীহ বুখারী
বর্তমানে ফেতনার যুগে মানুষের ঈমান হেফাজতের জন্য দাওয়াতের মেহনত অত্যন্ত জরুরি। উলামায়ে কেরামের মতে, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দ্বীন শিখতে পারেননি, তাদের জন্য তাবলিগ জামাতে গিয়ে দ্বীন শেখা এবং অপরকে দাওয়াত দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাবলীগ জামাতের মসজিদে থাকা ও খাওয়া: দালিলিক প্রমাণ
সমালোচকরা বলেন, মসজিদে থাকা, খাওয়া বা ঘুমানো জায়েজ নেই। অথচ হাদিস শরীফে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
আসহাবে সুফফার দৃষ্টান্ত:
নবীজির যুগে মসজিদে নববীতে 'আসহাবে সুফফা' নামে সাহাবীদের একটি জামাত থাকতেন। তারা মসজিদে থাকতেন, ঘুমাতেন এবং সেখানেই ইলম চর্চা করতেন।
ইতিকাফের বিধান:
শরীয়তে ইতিকাফের বিধান রয়েছে। তাবলীগ জামাতের সাথীরা যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তারা নফল ইতিকাফের নিয়ত করেন। ফিকহী মাসআলা অনুযায়ী:
- ইতিকাফকারীর জন্য মসজিদে পানাহার করা ও ঘুমানো জায়েজ।
- মুসাফির বা আল্লাহর রাস্তার পথিকদের জন্য মসজিদে অবস্থানের অনুমতি আছে।
সুতরাং, তাবলীগ জামাতের মসজিদে অবস্থান করা সম্পূর্ণ সুন্নাহ সম্মত এবং শরীয়ত সিদ্ধ।
তাবলীগ জামাতের ভ্রান্ত আকিদা বিষয়ক অপপ্রচারের জবাব
বিরোধীরা প্রায়ই সার্চ করে "তাবলীগ জামাতের ভ্রান্ত আকিদা" লিখে। অথচ তাবলীগ জামাত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার বাইরে নতুন কোনো মতবাদ প্রচার করে না।
তাবলীগ জামাতের মূল ভিত্তি হলো ৬ টি উসুল বা গুণ:
- ঈমান (কালিমা): আল্লাহর একত্ববাদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য।
- নামাজ: খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায়।
- ইলম ও জিকির: দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও স্মরণ।
- ইকরামুল মুসলিমিন: মুসলমান ভাইয়ের সম্মান ও সেবা।
- সহীহ নিয়ত: একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা।
- দাওয়াত ও তাবলীগ: আল্লাহর পথে সময় দেওয়া।
এই ৬টি গুণের প্রতিটিই কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তারা শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে এবং সহীহ আমলের দিকে ফিরিয়ে আনার মেহনত করে। তাদের কোনো গোপন এজেন্ডা বা ভ্রান্ত আকিদা নেই, বরং তারা দেওবন্দী উলামায়ে কেরাম ও বিশ্বের বরেণ্য আলেমদের দিকনির্দেশনায় চলে।
তাবলীগ জামাতের ভুল: বাস্তবতা ও সংশয় নিরসন
মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। "তাবলীগ জামাতের ভুল" বলে যা প্রচার করা হয়, তা মূলত ব্যক্তিগত ভুল, জামাতের নীতিগত ভুল নয়।
যেমন, কোনো সাধারণ সাথী যদি হাদিস বর্ণনায় অসতর্কতাবশত ভুল করে, তবে সেটা তার ব্যক্তিগত ত্রুটি। জামাতের মুরুব্বীরা সর্বদা সহীহ আকিদা ও সহীহ হাদিস চর্চার ওপর জোর দেন। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মেহনতের মাধ্যমে বেনামাজি থেকে নামাজি হয়েছেন, যা এই জামাতের হক হওয়ার সবচেয়ে বড় দলিল।