তাবলীগ জামাত: দ্বীনি মেহনত, উদ্দেশ্য এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট

বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের ঈমান ও আমল ঠিক করার জন্য যে নীরব বিপ্লব চলছে, তার নাম তাবলীগ জামাত। রাজনীতিমুক্ত এই আন্দোলনটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে ইসলামের শান্তির বাণী। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো তাবলীগ জামাত কি ও কেন, এর উদ্দেশ্য এবং বাংলাদেশে এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে।

তাবলীগ জামাতের অর্থ কী?

সহজ ভাষায়, তাবলীগ জামাতের অর্থ কী তা বুঝতে হলে দুটি শব্দের দিকে তাকাতে হবে। 'তাবলীগ' (تبليغ) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো পৌঁছানো, প্রচার করা বা প্রসার করা। আর 'জামাত' অর্থ হলো দল বা গোষ্ঠী। সুতরাং, পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর দ্বীনকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যে দলবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানো হয়, তাকেই তাবলীগ জামাত বলা হয়। এটি মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের তরিকার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি দ্বীনি আন্দোলন।

তাবলীগ জামাত কি ও কেন?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাবলীগ জামাত কি ও কেন? তাবলীগ জামাত কোনো নতুন দল বা মাযহাব নয়। এটি হলো আত্মশুদ্ধির একটি পাঠশালা। ১৯২৭ সালে ভারতের মেওয়াতে হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এই মেহনতের গোড়াপত্তন করেন।

মানুষ যখন দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষকে পুনরায় মসজিদমুখী করা এবং তাদের মধ্যে ঈমানী জজবা তৈরি করার জন্যই এই মেহনতের সূচনা হয়। এর মূল লক্ষ্য অন্যকে সংশোধন করার আগে নিজেকে সংশোধন করা।

তাবলীগ জামাত কি ও কেন?
তাবলীগ জামাত কি ও কেন?

তাবলীগ জামাতের উদ্দেশ্য কী?

এই মেহনতের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। সংক্ষেপে তাবলীগ জামাতের উদ্দেশ্য কী তা নিচে আলোচনা করা হলো:

  1. ঈমান মজবুত করা: আল্লাহর বড়ত্ব ও তাওহীদ অন্তরে বদ্ধমূল করা।
  2. সুন্নতি জিন্দেগী: রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার জীবন পরিচালনা করা।
  3. সালাত: রাসুল (সা.) এর শিখানো সাহাবীওয়ালা সালাত কায়েম করা।
  4. ইলম ও জিকির: দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা এবং আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখা।
  5. ইকরামুল মুসলিমীন: মুসলমান ভাইদের সম্মান ও সেবা করা।
  6. এখলাসে নিয়্যত: প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।
  7. দাওয়াত ও তাবলীগ: জান ও মাল খরচ করে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া।

তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ এর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ১৯৪৪-৪৬ সালের দিকে বাংলাদেশে এই কাজের সূচনা হয়। ঢাকার কাকরাইল মসজিদ হলো বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র।

সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা। প্রতি বছর টঙ্গীর তুরাগ তীরে লাখো মুসল্লির এই সমাগম প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তাবলীগের মেহনত কতটা গভীরে প্রোথিত। এটি বাংলাদেশের ইসলামি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

তাবলীগ জামাতের বর্তমান অবস্থা

বিশ্বব্যাপী এই মেহনত ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমানে কিছু অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তাবলীগ জামাতের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মতাদর্শগত কারণে এটি বর্তমানে দুটি ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, সবচেয়ে বড় পক্ষটিই ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে দাওয়াত, তালিম, গাস্ত এবং চিল্লা লাগানোর কাজ অব্যাহত রেখেছে।

সাময়িক বিভক্তি সত্ত্বেও মসজিদগুলোতে ইমাম সাহেব ও হক্কানি আলেমদের নিগড়ানিতে তাবলীগের কাজ চলমান রয়েছে। সাধারণ মানুষ রাজনীতিমুক্ত এই আমলটিকে এখনো নিজেদের আত্মশুদ্ধির সেরা মাধ্যম হিসেবে মনে করেন। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে দ্বীনের ফেরা এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাবলীগ জামাত আজও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

উপসংহার:
তাবলীগ জামায়াত কী—তা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি একটি প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক আমল। আল্লাহর রাস্তায় সময় দিয়ে নিজের ঈমান ও আমল ঠিক করাই এর মূল শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন এবং দ্বীনের পথে কবুল করুন।

Next Post Previous Post