টঙ্গীতে শুরু হয়েছে তাবলিগ জামাতের ঐতিহ্যবাহী ৫ দিনের জোড় ইজতেমা

গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত বিশ্ব ইজতেমা ময়দান আবারও প্রস্তুত হয়েছে একটি আধ্যাত্মিক ও দাওয়াতি মিলনমেলার জন্য। শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ফজরের নামাজের পর আম বয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ী নেজামের (আলমী শুরা) আয়োজনে পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমা। আগামী ২ ডিসেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এই বিশেষ জোড়ের সমাপ্তি ঘটবে। তাবলিগ জামাতের গণমাধ্যম সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান বৃহস্পতিবার রাতে একাধিক গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্ব ইজতেমার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই জোড় আয়োজিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি সমাবেশ নয়, বরং তাবলিগের সাথীদের জন্য সারা বছরের দাওয়াতি কাজের নকশা প্রণয়ন ও রাহবারি গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

জোড় কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

“পাঁচ দিনের জোড় তাবলিগ জামাতের সোনালী ঐতিহ্য” এখানে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ মুরুব্বিগণ একত্রিত হন। সাথীরা গত এক বছরের দাওয়াতি কাজের কারগুজারি পেশ করেন এবং আগামী বছরের জন্য দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেন। আমল, দাওয়াত, তরতিব, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয় বর্জনীয় সব বিষয়ে গভীর আলোচনা ও বয়ান হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই জোড়ে শুধুমাত্র তিন চিল্লা পূর্ণ করা সাথী এবং কমপক্ষে এক চিল্লা সময় দেওয়া আলেমরাই অংশ নিতে পারেন। এই কঠোর শর্তই জোড়ের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও গাম্ভীর্য বজায় রাখে।

৫ দিনের জোড়
টঙ্গীতে শুরু হচ্ছে তাবলিগ জামাতের ঐতিহ্যবাহী ৫ দিনের জোড় ইজতেমা

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা

অতীতে এই জোড় ১০ দিন করে হতো, ১৯৯৬ সালের পর থেকে ৫ দিন করে হচ্ছে। বিগত দিনে পাঁচ দিনের জোড়ে বয়ান করেছেন তাবলিগের বিশ্ববিখ্যাত বুজুর্গগণ। মাওলানা সাঈদ আহমদ খান পালনপুরী (রহ.), মাওলানা উমর পালনপুরী (রহ.), মাওলানা ওবাইদুল্লাহ বালিয়াভী (রহ.), কারী জহির (রহ.), মিয়াজী মেহরাব (রহ.) সহ আরও অনেকে। আজও প্রতি বছর ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহ.) ও হযরতজী মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.)-এর সোহবতপ্রাপ্ত প্রবীণ মুরুব্বিগণ টঙ্গীতে সমবেত হন। এবারও তাঁদের পদধ্বনিতে মুখরিত হবে ইজতেমা ময়দান।

📌 মিম্বারের আমালের ফায়সালাসমূহ

আলহামদুলিল্লাহ, আকাবির ও ওলামায়ে কেরামের নেগরানিতে, আলমী শুরার মাতাহাতে বাংলাদেশের পুরানো সাথীদের পাঁচ দিনের জোড় (২০২৫) বর্তমানে টঙ্গীর ময়দানে চলমান।

🗓️ ২৮ নভেম্বর ২০২৫ – শুক্রবার (১ম দিন)

  • বাদ ফজর: মাওলানা ওমর ফারুক হাফিঃ (বাংলাদেশ)
  • কারগুজারী (৯:৩০–১১:৩০): মাওলানা আব্দুর রহমান হাফিঃ (হিন্দুস্তান)
  • বাদ জুমা: মাওলানা ফারুক সাহেব হাফিঃ (বাংলাদেশ)
  • বাদ আসর: মাওলানা আহমাদ বাটলা হাফিঃ (পাকিস্তান)
  • বাদ মাগরিব: মাওলানা আব্দুর রহমান হাফিঃ (হিন্দুস্তান)

🗓️ ২৯ নভেম্বর ২০২৫ – শনিবার (২য় দিন)

  • বাদ ফজর: মাওলানা উবাইদুল্লাহ সাহেব (আলীগড়, ভারত) – ৬ নম্বর বয়ান
  • বাদ নাস্তা (১২:৩০ পর্যন্ত): কারগুজারী
  • বাদ যোহর: জরুরত
  • বাদ আসর: ভাই হাসমত সাহেব (পাকিস্তান)
  • বাদ মাগরিব: মাওলানা আহমাদ বাটলা সাহেব

🗓️ ৩০ নভেম্বর ২০২৫ – রবিবার (৩য় দিন)

  • বাদ ফজর: বেরুনী/বিদেশী তাশকিল – নাঈম সাহেব (রাইবেন্ড)
  • বাদ নাস্তা (১০:০০): ৫ কাজের মোজাকারা – হাকিম আব্দুল মান্নান সাহেব
  • বাদ আসর: মাস্তুরাতের মোজাকারা – ভাই ইকবাল সাহেব (ইন্ডিয়া)
  • বাদ মাগরিব: মুফতি আসলাম সাহেব (ইন্ডিয়া)

🗓️ ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ – সোমবার (৪র্থ দিন)

  • বাদ ফজর: ২-৩-৪ জানুয়ারি খুরুজের জোর ও মসজিদওয়ার জামাতের আযায়েম – মুফতি আবু বকর সাহেব (ইন্ডিয়া)
  • বাদ নাস্তা (১০:০০): মেম্বার বয়ান
  • তবকাওয়ার: ভাই ইকবাল সাহেব
  • উলামা (টিন শেড): মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেব
  • সাধারণ মাজলিস: মাওলানা ইজহার সাহেব
  • আরবি: মাওলানা আহমাদ বাটলা সাহেব
  • উর্দু (৪০০+): ওয়াহিদ সাহেব / নাঈম সাহেব
  • তুর্কি: ভাই সালমান সাহেব
  • ইংরেজি: ভাই হাসমত সাহেব
  • থাই: ভাই তানভীর সাহেব (বেঙ্গালুরু)
  • বাদ আসর: মাওলানা রবিউল হক সাহেব
  • বাদ মাগরিব: মাওলানা জুবায়ের সাহেব

🗓️ ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ – মঙ্গলবার (৫ম দিন – সমাপ্তি)

  • বাদ ফজর: হেদায়েতের কথা – মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেব (হিন্দুস্তান)
  • আখেরি মোনাজাত ও দোয়া: মাওলানা আহমাদ বাটলা সাহেব (পাকিস্তান)

🕌 ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচি

  1. ফজর: ৫:৪৫
  2. যোহর: ১:৩০
  3. আসর: ৪:০০
  4. মাগরিব: ৫:২০
  5. এশা: তাশকিলের পর — আজানের ৩০ মিনিট পর জামাআত

২০২৬-এর বিশ্ব ইজতেমা কবে?

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের পরই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে, তবে ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি ময়দানে খুরুজের জোড় হবে ইন শা আল্লাহ। সে কারণে এবারের জোড় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই আগামী বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ভিত্তি রচিত হবে।

যখন পুরো দেশ রাজনীতি আর অর্থনীতির উত্তেজনায় মগ্ন, তখন টঙ্গীর এই ময়দান নিরবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মানুষের আসল শান্তি ও সাফল্য কেবল আল্লাহর দিকে ফিরে আসাতেই নিহিত। আগামী পাঁচ দিন হাজারো দাঈ এখানে একত্রিত হয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবেন। আল্লাহ এই জোড়কে কবুল করুন এবং সকল সাথীকে হেদায়েত ও বরকত দান করুন (আমিন)। ইন শা আল্লাহ, আগামীতে আবার দেখা হবে বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে। ততক্ষণ, দাওয়াতের পথে অবিচল থাকুন।

Previous Post