তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ও বর্তমান আমির
বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় নীরব বিপ্লবের নাম 'দাওয়াত ও তাবলীগ'। এই মহান মেহনতের পেছনে যার অক্লান্ত পরিশ্রম ও চোখের পানি মিশে আছে, তিনি হলেন হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। অনেকেই জানতে চান তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা কে এবং তাঁর জীবনী সম্পর্কে। আজকের আর্টিকেলে আমরা তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান জিম্মাদার বা আমির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বিশ্ব দাওয়াতে তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
বর্তমান সময়ে প্রচলিত তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.)। তিনি ছিলেন ভারতের সাহারানপুর জেলার কান্ধলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারের সন্তান। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতের মেওয়াত অঞ্চল থেকে তিনি এই ঈমানী মেহনতের সূচনা করেন, যা আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।
মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) কে ছিলেন? সংক্ষিপ্ত জীবনী
হযরত ইলিয়াস (রহ.) ১৮৮৫ সালে (১৩০৩ হিজরি) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধমনীতে ছিল সিদ্দিকী ও ফারুকী বংশের রক্ত। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিকতা ও ইলমে দ্বীনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনা
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন নিজ পরিবারে এবং পরবর্তীতে দারুল উলুম দেওবন্দের বুজুর্গ আলেমদের সান্নিধ্যে আসেন। তিনি শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.) এবং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.)-এর মতো মহান মনীষীদের ছাত্র ও মুরিদ ছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা এতই উচ্চে ছিল যে, সমসাময়িক আলেমরা তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।
তাবলিগ জামাতের সূচনা
১৯২০-এর দশকে তিনি মেওয়াত অঞ্চলের অশিক্ষিত ও দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়া মুসলিমদের অবস্থা দেখে ব্যথিত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, শুধুমাত্র মাদরাসা স্থাপন করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ঈমান রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি সাধারণ মানুষকে দ্বীন শেখানোর জন্য 'দাওয়াত ও তাবলীগ'-এর এই পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর মূল স্লোগান ছিল "হে মুসলমান, তোমরা মুসলমান হয়ে যাও"।
তাবলীগ জামাতের বর্তমান আমির কে?
তাবলীগ জামাতের নেতৃত্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর ইন্তেকালের পর তাঁর ছেলে হযরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.) এবং এরপর হযরত মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.) এই মহান দায়িত্ব পালন করেন। তবে মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর বর্তমানে তাবলীগ জামাতের সর্বসম্মত একক কোনো আমির নেই।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী তাবলীগ জামাতের এই মেহনত কোনো একক ব্যক্তির নেতৃত্বে নয়, বরং 'আলমি শুরা' বা বিশ্ব পরামর্শক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। মুরুব্বীদের পরামর্শ ও সমন্বয়ের ভিত্তিতেই এখন ইজতেমা ও জামাতের কার্যক্রম চলে।
প্রতিষ্ঠাতার প্রপৌত্র মাওলানা সাদ কান্ধলভী দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের নেতৃত্বে থাকলেও, তার কিছু বিতর্কিত বক্তব্য এবং জমহুর উলামাদের সাথে মতভেদের কারণে তিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ তাকে 'বিতর্কিত' ঘোষণা করেছেন। তাই বর্তমানে মূল ধারার তাবলীগ জামাত কোনো একক ব্যক্তির অনুসরণ না করে, হক্কানি আলেমদের তত্ত্বাবধানে শুরা পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
ইলিয়াস নামের অর্থ কী?
অনেকেই জানতে চান "ইলিয়াস নামের অর্থ কী"। 'ইলিয়াস' (إلياس) মূলত একজন বিখ্যাত নবীর নাম। পবিত্র কুরআনে হযরত ইলিয়াস (আ.) এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হিব্রু ও আরবি ভাষার ব্যুৎপত্তি অনুসারে ইলিয়াস নামের অর্থ হলো:
- আল্লাহই আমার প্রভু।
- যিনি আল্লাহর প্রতি সমর্পিত।
- সুউচ্চ বা মর্যাদাবান।
সুতরাং, ইলিয়াস নামটি অত্যন্ত বরকতময় এবং মুসলিম শিশুদের জন্য এটি একটি উত্তম নাম।
উপসংহার
মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর সেই ছোট মেহনত আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তাঁর জীবনী ও ত্যাগের ইতিহাস আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা এই মেহনতকে কবুল করুন এবং আমাদেরকে দ্বীনের পথে চলার তৌফিক দান করুন।