তাবলীগ জামাতের সোনালী ইতিহাস: উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও বিশ্বব্যাপী প্রসার
বর্তমান বিশ্বে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ‘দাওয়াত ও তাবলীগ’ একটি অসামান্য ও অবিস্মরণীয় নাম। অনেকেই অনলাইনে 'তাবলীগ জামাতের ইতিহাস pdf' বা বিস্তারিত ইতিহাস খোঁজেন। একটি ছোট মসজিদ থেকে শুরু হওয়া এই মেহনত কীভাবে আজ বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হয়েছে, তা জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজ আমরা ইতিহাসের সেই সোনালী পাতা উল্টে দেখব।
তাবলীগ জামাতের প্রেক্ষাপট: মেওয়াতের অন্ধকার যুগ
তাবলীগ জামাতের ইতিহাসের সূচনা হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতের দিল্লির অদূরে অবস্থিত 'মেওয়াত' নামক অঞ্চল থেকে। সেই সময় মেওয়াতের মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। তারা নামে মুসলিম হলেও তাদের জীবনাচার, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসে হিন্দুয়ানি প্রথার গভীর প্রভাব ছিল। নামাজ, রোজা বা দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান তাদের মধ্যে ছিল না বললেই চলে।
এমন এক অন্ধকার সময়ে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের ফিকির বা চিন্তা জাগ্রত করে দেন একজন মহান মনীষীর অন্তরে, যার নাম হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.)।
তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সূচনাকাল
তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (রহ.)। তিনি ১৯২০-এর দশকে মেওয়াত এলাকায় প্রথমে মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দ্বীন প্রচারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন, মাদরাসা তৈরি করে কেবল শিশুদের দ্বীন শেখানো সম্ভব, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বয়স্ক মানুষ, যারা কৃষি বা ব্যবসায় ব্যস্ত, তারা অজ্ঞতার অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।
গভীর চিন্তা ও আল্লাহর কাছে দীর্ঘ মোনাজাতের পর তিনি বুঝতে পারলেন, মানুষকে দ্বীন শেখানোর জন্য তাদের কাছে গিয়ে দাওয়াত দিতে হবে। ১৯২৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেহনতের সূচনা করেন। দিল্লির নিজামুদ্দিনে অবস্থিত 'বাংলোওয়ালি মসজিদ' ছিল এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, যা আজ বিশ্ব তাবলীগ জামাতের মারকাজ হিসেবে পরিচিত।
মেহনতের ক্রমবিকাশ: তিন যুগের ইতিহাস
তাবলীগ জামাতের ইতিহাসকে প্রধানত তিনজন জিম্মাদার বা আমিরের যুগে ভাগ করা যায়। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই কাজ ধাপে ধাপে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
১. হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর যুগ (১৯২৭-১৯৪৪)
এটি ছিল তাবলীগের ভিত্তি স্থাপনের যুগ। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) নিজেই মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বলতেন, “ভাই, দ্বীন শিখো এবং দ্বীনের ওপর চলো।” তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “এ্যায় মুসলমান! মুসলমান বানো” (হে মুসলমান! তোমরা প্রকৃত মুসলমান হও)। চরম কষ্ট, অনাহার এবং মানুষের অপমান সহ্য করে তিনি সাধারণ মেওয়াতীদের সাহাবায়ে কেরামের নমুনার ওপর তৈরি করেছিলেন।
২. হযরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.)-এর যুগ (১৯৪৪-১৯৬৫)
মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র হযরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.) এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সময়ে তাবলীগ জামাত ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে আরব বিশ্ব এবং ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দাওয়াতের ছয়টি গুণ বা 'ছয় উসুল' (কালিমা, নামাজ, ইলম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন, তাসহীহে নিয়ত, দাওয়াত ও তাবলীগ) কে সুবিন্যস্ত করেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ 'হায়াতুস সাহাবা' দাওয়াতের ময়দানে আজও অদ্বিতীয় কিতাব হিসেবে গণ্য।
৩. হযরত মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)-এর যুগ (১৯৬৫-১৯৯৫)
তৃতীয় ধাপে হযরত জি মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.) এর সময়ে এই কাজ বিশ্বব্যাপী এক বিশাল আকার ধারণ করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। তাঁর বিচক্ষণ পরিচালনায় তাবলীগ জামাত একটি সুশৃঙ্খল বৈশ্বিক রূপ লাভ করে।
বাংলাদেশে তাবলীগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা
বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ১৯৪৪-৪৫ সালের দিকেই তাবলীগের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে কাকরাইল মসজিদকে কেন্দ্র করে এই কাজ জোরদার হয়। তাবলীগ জামাতের ব্যাপক প্রসারের ফলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯৬৭ সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজন শুরু হয়, যা আজ হজের পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত।
বর্তমান অবস্থা ও শুরা পদ্ধতি
১৯৯৫ সালে হযরত মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর জামাতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি 'শুরা' বা পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই পদ্ধতিতেই কাজ সুশৃঙ্খলভাবে চলে আসছিল।
বর্তমানে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর কিছু একক সিদ্ধান্ত এবং জমহুর উলামাদের সাথে মতভেদের কারণে বিশ্বব্যাপী তাবলীগ জামাতের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। তবে মূল ধারার তাবলীগ জামাত কোনো একক ব্যক্তির নেতৃত্বের পরিবর্তে হক্কানি উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে 'আলমি শুরা' বা বিশ্ব পরামর্শ সভার মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। দারুল উলুম দেওবন্দ এবং বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাজের মুরুব্বীরা এই শুরা পদ্ধতির ওপরই অটল রয়েছেন।
উপসংহার
তাবলীগ জামাতের ইতিহাস কোনো ক্ষমতার ইতিহাস নয়, এটি ত্যাগের ইতিহাস। সাহাবায়ে কেরামের যেই মেহনত পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল, মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) সেই মেহনতকে পুনর্জীবিত করেছেন। আজ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে আল্লাহু আকবার ধ্বনি পৌঁছানোর পেছনে এই জামাতের অবদান অনস্বীকার্য।