দাওয়াতের গুরুত্ব ও দাঈর গুণাবলী | হযরত মাওলানা সাঈদ খান (রহঃ)
দাঈ দাওয়াতের কাজে কখনও কানাআত করবেনা। কানাআত অর্থ অল্প তুষ্টি। দুনিয়ার ব্যাপারে কানাআত করবো ঠিকই কিন্ত আখিরাতের ব্যাপারে কানাআত করব না। দুনিয়ার ব্যাপারে নিজের চেয়ে কম দরজার লোকের প্রতি নজর করা আর আখিরাতের ব্যাপারে নিজের চেয়ে উঁচু দরজার লোকের প্রতি নজর রাখা।
দুনিয়াতে যত গুনাহ বা নাফরমানী হচ্ছে তা কেবল আমার ফিকির ও মেহনতের কমতির কারণে হচ্ছে এরকম মনে করা।
দাঈ নিজকে ছোট মনে করবে, অন্যকে বড় মনে করবে। নিজের দোষ দেখা আর অন্যের গুণ দেখা। হয়তো আমার দোষের কারণে আমি কেয়ামতের দিন আটকে যাবো আর যার দোষ দেখছি হয়তো তার গুণের কারণে সে নাজাত পেয়ে যাবে।
দাঈর পরিচয়
দাঈ কখনও রাগ করবেনা। দাঈ রাগকে দমিয়ে রাখবে, কখনও আক্রোশ হতে দিবেনা। রাগ করলে সাথী ও কাজ বিগড়ে যাবে।
দাঈ সবরকারী ও কষ্ট সহিষ্ণু হতে হবে। প্রতিটি দাঈকে মাটির মত সবর করতে হবে। উটের মত কষ্ট সহিষ্ণু হতে হবে। উট একদিন খেয়ে কয়েকদিন চলতে পারে।
পাহাড়ের মত অটল হবে। দাঈকে পাহাড়ের মত অটল হতে হবে। পাহাড় যেমন সকল পরিস্থিতির মোকাবেলায় নিজের স্থানে, অটল, অচল থাকে ঠিক তেমনি দাঈ সকল অবস্থাতে দাওয়াতের কাজের উপর অটল থাকবে, কোন হালতেই যেন তাকে দাওয়াতের কাজ থেকে সরাতে না পারে।
দাঈ'র মন আকাশের মত উদার হবে। সমুদ্রের ন্যায় বিশাল হবে। মন কখনো গ্লাসের পানির ন্যায় হবেনা। এক ফোঁটা প্রশ্রাব গ্লাসের পানিকে নাপাক করে দেয় কিন্ত শত শত গ্লাস প্রশ্রাব কখনো সমুদ্রের পানিকে নাপাক করতে পারেনা। তদ্রুপ কারো খারাপ ব্যবহারে মন খারাপ না করা। অন্যদের খুটিনাটি দোষ উপেক্ষা করে চলা।
দাঈর দায়িত্ব ও কর্তব্য
দাঈ কখনও গাফেল, সময় নষ্টকারী হবেনা। দাঈ এক মুহূর্তও গাফেল থাকবে না বা অযথা সময় নষ্ট করবে না। নিজের সময়ের হেফাজত করবে। নিজেকে কোনো না কোনো নেক আমলে মশগুল রাখবে।
সাদেগী অর্থাৎ সাদাসিধা জীবন যাপন করা। যদি বাদশাহও হয়ে যায় তথাপিও কোনো আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন না করা। যেমন ওমর (রাঃ) এর জীবন।
হুজুর (সঃ) ওয়ালা আখলাক হওয়া চাই। কারো অনিষ্ট কামনা না করা। দাঈ যখন হাসিমুখে শত্রুর উপকার করতে পারবে তখন বুঝতে হবে যে তার মধ্যে আখলাক এসে পড়ছে।
মোয়ামালাত ও মুয়াশারাত: ইসলামী তরীকায় হতে হবে। মোয়ামালাত লোকের সাথে চলাফেরা উঠাবসা লেনদেনকে বলা হয়। নিজের দেনা দিয়ে দেওয়া এবং পাওনার জন্য কড়াকড়ি না করা। মুয়াশারাত হলো ব্যবসা-বাণিজ্য, কায়কারবার যা ইসলামী তরীকায় করা, যার দ্বারা মানুষের ফায়দা পৌঁছে।
দাঈর বৈশিষ্ট্য
দাঈ কখনও মদ'য়ু হবে না। দাঈ কাকে বলে? যে কোনো কিছুর দিকে দাওয়াত দেয় তাকে দাঈ বলে। আর যাকে দাওয়াত দেয়া হয় তাকে মদ'য়ু বলে। দাঈকে যেন অন্য কেউ কোনো কিছুর দিকে দাওয়াত দেয়ার সুযোগ না পায়। আর দিলেও যেন কবুল না করে যেমন নামাজরত ব্যক্তি যেমন সালামের কোনো জবাব দিতে পারেনা এমন। অথচ নামাজের বাইরে সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। ঠিক তদ্রুপ দাওয়াতের কাজ যারা করে তারা অন্য কোনো কাজ কবুল করবে না বা নিজেকে অন্য কোনো কাজে জড়াবেনা।
দাঈ'র সব কাজে এখলাছ থাকতে হবে। এখলাছের ফতোয়া-দুনিয়ার কোনো মুফতি সাহেবই দিতে পারবে না, কেবল কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা এর বদলা দান করবেন। শহীদ, ক্বারী, আলেমের ছহীর ফতোয়া আল্লাহ তা'আলাই দিবেন।
এছতেখলাছও থাকতে হবে। প্রতিটি আমল এরূপ এখলাছের সাথে হওয়া দরকার যা শুধু কেবল আল্লাহ তায়ালার জন্যই, তার সাথে অন্য কোনো জায়েজ জিনিসও সামিল না করা। যেমন- চাশতের নামাজের দ্বারা রুজীর চিন্তা বা বরকতের চিন্তা না করা।
দাঈ'র খাছ একীন থাকতে হবে। হযরত মুসা (আঃ) এর খাছ এক্কীন ছিল কিন্তু উম্মতের ছিল না। যে কারণে মুসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে সকল উম্মতকে নিয়ে যখন ফেরাউনের রাজ্য ত্যাগ করতে ছিলেন তার সামনে নীল দরিয়া পড়ল, অপর দিকে পিছন থেকে ফেরাউনের সৈন্য সামন্ত ধাওয়া করতে আসছিল, ঠিক ঐ সময় উম্মতগণ বলে উঠল আমরা তো ধরা পড়ে গিয়াছি কিন্ত হযরত মুসা (আঃ) বলে উঠলেন, 'কাল্লা' অর্থাৎ কখনও না। দাঈকে মনে রাখতে হবে, যে কোনো অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করবেন। অর্থাৎ দৃঢ় আশা ষোল আনাই রাখতে হবে। যা কিছু ছওয়াব ও বরকত দাওয়াতের কাজে রয়েছে সবই পাবো।
এছতেখুলাছ অর্থাৎ কত বড় কাজ করছি সেটার খেয়াল যেন থাকে। দাওয়াতের কাজের মধ্যে হালকাপনা না করা। কারণ এ কাজ তো আম্বিয়া কেরামগণের ছিল।
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আমরা সবাই নতুন, পুরাতন ঐ ব্যক্তিই যার দিলে আল্লাহ ছুবহানাহু তায়ালা এই কাজের সহি বুঝ দান করেছেন। চাই সে আলেম হোক অথবা বে-আলেম হোক, বয়ান করতে পারুক বা নাই পারুক।
দায়ীর আচরণ
আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ) বলেন, মানুষ মাতা ও পিতার দুটো নাপাক বস্তুর ভিতর দিয়ে দুনিয়াতে এসেছে, কিছুদিন পর মাটিতে মিশে পঁচে, গলে যাবে তার আবার অহংকার কিসের?
অহংকার ও বদমেজাজী লোকদের কাল কেয়ামতের দিন হিসাব নিকাশ শুরু হবার পূর্বেই জাহান্নামে পাঠানো হবে। ঐ ব্যক্তিই খারাপ যে খুব দর্প ভরে চলে এবং মানুষ তার নিকট নিজস্ব কথা ফ্রি হয়ে পেশ করতে দ্বিধা করে।
হুজুর (সাঃ) এর প্রতি এরশাদ হয়েছে যে হে নবী আপনি সমস্ত গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ আপনার নিকট থেকে ভাগতে থাকবে, জুদা হতে থাকবে যদি আপনার নরম দিল, মিঠা জবান না হতো।