মাস্তুরাতের কাজ | নেককার নারীর দৈনন্দিন দ্বীনি আমল
আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা পুরুষ এবং মহিলা উভয়কেই সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়কেই দ্বীনের জিম্মাদারী দিয়েছেন। পুরুষরা যেমন হুজুর (সাঃ)-এর উম্মত, মা-বোনেরাও তেমনি হুজুর (সাঃ)-এর উম্মত। সুতরাং পুরুষদের যেমন দ্বীনের জিম্মাদারী রয়েছে, মাস্তুরাতদেরও তেমন দ্বীনের জিম্মাদারী রয়েছে। তবে মেয়েদের মেহনতের ময়দান ভিন্ন।
নিঃসন্দেহে মেয়েদের কাজ তো ঘরের ভেতরেই। তবে কখনও কখনও মাশোয়ারা সাপেক্ষে নিজ মাহরামের সাথে কম বা বেশি সময়ের জন্য নিকটে বা দূরে মেয়েদের জামাতের সাথে দাওয়াতের মেহনত শিখার জন্য এবং বিশেষভাবে মেয়েদের জেহান বানানোর জন্য বের হওয়া।
আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে কাজের তরতীব শিক্ষা করা এবং আমল চালু করা যাতে ঘরের মধ্যে দ্বীনের পরিবেশ কায়েম হয়। একজন নেককার মহিলা সত্তর জন অলীর চেয়েও উত্তম। আর একজন বদকার মহিলা এক হাজার বদকার পুরুষের চেয়েও নিকৃষ্ট।
একজন মহিলা তাঁর ২৪ ঘণ্টা জিন্দেগীতে ঘরের মধ্যে যে সকল কাজ করবেন তা নিম্নরূপ:
-
রোজানা ঈমানী মোজাকারা করা: ঈমানী মোজাকারা করলে ঈমান তাজা হয়। তাই ঘরে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫-২০ মিনিট ঈমানী আলোচনা করা চাই। ঘরের বাচ্চা এবং মাহরামের সাথে আল্লাহর থেকে হওয়ার একিন আলোচনা করলে তাদের দীলে আল্লাহর থেকে হওয়ার একিন মজবুত হবে। যে যত বেশি ঈমানী আলোচনা করবে তার ঈমান তত বেশি মজবুত হবে। ৭৫% ভাগ ঈমান আসে বলার দ্বারা।
-
রোজানা পরামর্শ করা: ঘরের প্রতিটি কাজ, সেটা দ্বীন সংক্রান্ত হোক বা দুনিয়া সংক্রান্ত হোক, পরামর্শ করে করা। পরামর্শ করে কাজ করলে আল্লাহ পাক ঐ কাজের মধ্যে খায়ের বরকত দান করেন, ক্ষতি থেকে হেফাজত করেন, আপোষে জোড়মিল মহব্বত পয়দা করেন।
-
আউয়াল ওয়াক্তে নামায আদায় করা: আমরা মেয়েরা ঘরে আউয়াল ওয়াক্তে নামায আদায় করবো। নামাজের চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার দেখে সময়সূচী তৈরি করে নিলে সবচেয়ে ভাল হয়। আউয়াল ওয়াক্তে নামায আদায় করলে ঐ নামাজ নূরানী হয়। মৃত্যুকালে কালেমা নসীব হয়। তাই দুনিয়াবী কাজ পিছে ফেলে নামাজকে আগে আদায় করে নিব।
-
রোজানা কোরআনে পাক তেলাওয়াত করা: প্রতিদিন ঘরে কোরআনে পাক তেলাওয়াত দ্বারা ঘরকে নূরানী করবো। যে ঘরে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, সেই ঘরে বরকত দেখা দেয়। কোরআনে পাককে আমরা চার নিয়তে তেলাওয়াত করবো:
কিছু খতমের নিয়তে: কোরআনের হক বছরে কমপক্ষে দুই খতম করা।
কিছু মুখস্তের নিয়তে পড়া: যেমন- সূরা ইয়াসিন, সূরা আর রহমান, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক ইত্যাদি।
কিছু বিশেষ আমলের নিয়তে তেলাওয়াত করা: যেমন- সূরা ইয়াসিন সকালে পাঠ করলে দশ খতম কোরআন তেলাওয়াতের ছওয়াব পাওয়া যায়। রাত্রে পাঠ করে মারা গেলে শহীদি মর্তবা নসীব হয়।
সূরা মুলক ও সূরা হা-মীম-সেজদা মাগরিব ও এশার মধ্যভাগে পড়লে আল্লাহ পাক কবর আযাব থেকে রক্ষা করবেন। সূরা ওয়াকিয়া রাত্রে পাঠ করলে আল্লাহ পাক রুজির অভাব থেকে মুক্ত রাখবেন।
কিছু অর্থ জানার নিয়তে পড়া: ৩০তম পারার ছোট ছোট সূরাগুলো, যেগুলো সাধারণত আমরা নামাজে ব্যবহার করি, সেগুলোর অর্থ জানা। অর্থ জানা থাকলে নামাজের মধ্যে ধ্যান-খেয়াল পয়দা হয়।
-
তিন তাসবীহ আদায় করা: প্রতিদিন সকাল-বিকাল তিন তাসবীহ আদায় করা। সময় নির্দিষ্ট করে অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে ধ্যান-খেয়ালের সাথে তিন তাসবীহ আদায় করা এবং সকল কাজ জিকিরের সাথে করা। নিয়মিত তিন তাসবীহ আদায় করলে আল্লাহ পাক তিনটি জিনিস দান করবেন- শান্তি, সম্মান ও রিজিক।
-
ইনফিরাদী দোয়ার এহতেমাম করা: দোয়া কবুল হওয়ার জন্য রুজি হালাল হওয়া জরুরী। মেয়েদের রুজি হালাল। তাই বেশি বেশি দোয়া করা। নিজের জন্য, বাচ্চাদের জন্য, স্বামীর জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য, পাড়া-প্রতিবেশীদের জন্য এবং সারা বিশ্বের জন্য দোয়ার হাতকে বাড়ানো।
-
রোজানা ঘরে তালিম করা: সময় ও জায়গা নির্দিষ্ট করে প্রতিদিন ঘরে তালিম করা। তালিমের সময় অন্য সমস্ত ঝামেলা মুক্ত হওয়া এবং পর্দার এহতেমাম করা। তালিমের দ্বারা আল্লাহ পাক বদ-দ্বীনকে ঘর থেকে মরা লাশের মত বের করে দিবেন। জমে জমে একাধারে ৪০ দিন তালিম করলে উহার উসিলায় আল্লাহ পাক একজন লোককে হেদায়েত দিয়েই দিবেন।
-
বাচ্চাদের দ্বীনি তরবিয়ত করা: মায়ের কোল বাচ্চাদের প্রথম মাদ্রাসা। এই জন্য মায়ের জিম্মাদারী হলো বাচ্চাদেরকে দ্বীন শিখানো।
ছোট বেলা থেকে বাচ্চাদের লেবাস-পোশাক, খানা-পিনা, অজু-গোসল, ঘুম প্রভৃতি সকল কাজ সুন্নত তরীকায় করার অভ্যাস করানো। বাচ্চারা কথা বলা শিখলেই কলেমা শিখানো। যার প্রথম কথা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং শেষ কথা হবে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ, সে হাজার বছর বেঁচে থাকলেও তার গুনাহ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাই করা হবে না।
-
স্বামীর মনসা মত চলা: স্বামীর মন বুঝে চলা। কখন স্বামী কোন কাজ করলে খুশি হবে, সে কাজ করা। স্বামীকে আমীর মানা। স্বামীর খেদমত করা যেন তাকে দিয়ে দ্বীনের ফায়দা লুটানো যায় এবং আল্লাহকে রাজি করা।
যদি কোন মহিলা তার স্বামী বলার আগেই তার খেদমত করে তাহলে সাত তোলা স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার ছওয়াব পাবে। আর স্বামী বলার পরে করলে সাত তোলা রৌপ্য আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার ছওয়াব পাবে।
-
আনেওয়ালা মেহমানদেরকে দ্বীনের কথা শুনিয়ে দেওয়া: আমার ঘরে যে সমস্ত মা-বোনেরা আসেন অথবা আমি যে সমস্ত মা-বোনদের বাসায় যাই, তাদের সাথে ইরান-তুরানের কেচ্ছা না বলে, দুনিয়াবী চিজ-আসবাবের কথা না বলে দ্বীনের কথা আলোচনা করা। দুনিয়াবী কথা শুরু করলে তা হেকমতের সাথে দ্বীনের দিকে পাল্টিয়ে দেওয়া। আমার মধ্যে সব সময় এই চিন্তা ফিকির আসা চাই কিভাবে দ্বীনের কথা বলা যায়।
-
সাদা সিধা জিন্দেগী এখতিয়ার করা: আমাদের পুরো জিন্দেগীর মধ্যে সাহাবা (রাঃ)-এর অনুসরণে যাবতীয় কাজ করার চেষ্টা করা। আমার আর কি কি প্রয়োজন, একথা না বলে আমার আর কোন জিনিস ছাড়া চলে, এটা চিন্তা করতে হবে। যে অল্প জিনিসে সন্তুষ্ট থাকবে, আল্লাহ পাক তার অল্প আমলে সন্তুষ্ট হবেন। সাদাসিধা জিন্দেগী যাপন করলে দুইটা লাভ:
- সময় বাঁচে এবং
- অর্থ বাঁচে।
যে সময় বাঁচে তাতে এবাদত বন্দেগী বেশি করা যায়। আর যে অর্থ বাঁচে তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা যায়।
-
সু-গৃহিনী হওয়া/সহধর্মীনী হওয়া: আমরা ঘরের যাবতীয় কাজ-কর্ম সুচারু ও সুনির্দিষ্টভাবে করবো। চিজ-আসবাব অল্পে দামী হোক কিন্তু তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবো। স্বামীকে ধর্মের ব্যাপারে সহযোগিতা করবো। হযরত খাদিজা (রাঃ) হুজুর (সাঃ)-কে দ্বীনের জন্য প্রত্যেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে আল্লাহ পাক তাঁকে ছালাম পাঠিয়েছিলেন।
-
মাহরাম পুরুষকে আল্লাহর রাস্তায় পাঠানো: ঘরের মধ্যে দ্বীনি পরিবেশ কায়েম করতে হলে পুরুষদের অবশ্যই দ্বীনদার হতে হবে। তাই বাড়িতে যে সমস্ত মাহরাম পুরুষ আছেন, যেমন- বাপ, ভাই, স্বামী, ছেলেদেরকে বুঝিয়ে সমঝিয়ে আল্লাহর রাস্তায় পাঠানো।
কোন মহিলা যদি তার মাহরাম পুরুষকে আল্লাহর রাস্তায় পাঠাতে পারে, তবে ঐ পুরুষ আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে যত ছওয়াব অর্জন করবেন, আল্লাহ তায়ালা ঐ মহিলাকে ঘরে বসেই তার সমান ছওয়াব দান করবেন এবং স্বামীর পাঁচশত বছর পূর্বেই জান্নাতে প্রবেশ করে সাজ-সজ্জা করে ইয়াকুতের ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবে।
আর যে মহিলা তার মাহরাম পুরুষ আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার সময় সামান গুছিয়ে দিবে, তাকে জান্নাতের মধ্যে এমন একটি ওড়না পরানো হবে, যার কারণে সমস্ত জান্নাত বিদ্যুতের মত চমকিতে থাকবে।
-
সবর ও শোকরের সাথে চলা: আমরা মাহরাম পুরুষকে আল্লাহর রাস্তায় বের করার পর সমস্ত কষ্টে সবর করব এবং আল্লাহ যে আমাদেরকে দ্বীনের বুঝ দিয়েছেন, এজন্য শোকর করবো। সবর ও শোকরের পুরস্কার হলো জান্নাত।
-
তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের সাথে জীবন কাটানো: তাকওয়া অর্থ আল্লাহর ভয়। আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধকে পুরাপুরিভাবে মেনে চলার চেষ্টা করবো। তাওয়াক্কুল অর্থ আল্লাহর উপর ভরসা।
সব ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর ভরসা করবো। এছাড়া আমাদের যাবতীয় লেনদেন, আচার-ব্যবহার সহিহ করবো, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েমের চেষ্টা করবো এবং আল্লাহর ফায়সালার উপর রাজি-খুশি থাকবো।